সন্ত্রাসদমন আইন নাকি ট্রানজিট-টিকফা-এফবিআইয়ের রক্ষাকবচ?

সন্ত্রাসদমন আইন নাকি ট্রানজিট-টিকফা-এফবিআইয়ের রক্ষাকবচ?

গোপনীয়তার কিছু নাই, আমি ধরেই নিয়েছি, আমরা যাই করি যাই ভাবি যাই স্বপ্ন দেখি সবই বিগব্রাদারের সর্বদর্শী প্যানঅপটিকনের দৃষ্টির তলে, এক হাজারচক্ষু দানবের নজরের অধীন। এটা এক ম্যাট্রিক্স ফিল্মের জগত, যেখানে আমাদের মগজে বসত করে অন্যজনা। কিন্তু না বলেও তো উপায় নাই।

cybercrime

ঠিক যেসময় ট্রানজিট চুক্তির বলে ভারতীয় ভেহিকেল সড়ক ও নৌপথ দিয়ে চলাচল শুরু করেছে, রামপালের মতো প্রকল্পগুলোতে ভারতীয়দের আনাগোনা ও স্থাপনা দৃশ্যমান হচ্ছে সেসময় সন্ত্রাস দমনে নতুন আইনটি যথেষ্ঠ লাগসই। যখন টিকফা সই হতে যাচ্ছে, এ অঞ্চলে এফবিআইসহ মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উতকট চেহারা নিতে যাচ্ছে, তখন দুই পরাশক্তির স্বার্থকে এনহ্যান্স করায়, সুরক্ষিত করায় এনহ্যান্সড দাঁতনখঅলা আইনের প্রয়োজন তো হবেই। ওস্তাদের মাইর নাকি শেষ রাতে!

আরো ভয়ংকর হচ্ছে, অনলাইন, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ, মেইলসহ ভার্চুয়াল পরিসরে আপনি বা আপনার নামে করা যেকোনো প্রতিবাদ, সামালোচনা, ক্ষোভকেই সন্ত্রাসী কার্যের সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে হাজির করা, বিনা বিচারে আটক করা এবং সম্পত্তি ক্রোক করার অগাধ ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে অনুরূপ আইনের বলেই স্টিং অপরাশেনের কৌশলে আপনাকে পটিয়ে উশকিয়ে আপনার মুখ থেকে কথা বের করে, বা আপনাকে জিম্মি করে নাফিস, বোস্টনের দুই ভাই বা লন্ডনের ছুরিবাজ ছেলেটির মতো ‌’সন্ত্রাসী’ হতে/সাজতে বাধ্য করতে পারবে। পারবে, আপনার বন্ধুকে আপনার পেছনে লাগিয়ে দিতে, আপনার মেইল-ফেসবুকসহ যাবতীয় অনলাইন অ্যাক্টিভিটিতে হানা দিতে। আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে। এবং পারবে, ভয় দেখিয়ে পুলিশ-র‌্যাব বা তাদের সোর্সদের নামে ব্যবসাও করতে!!! বিশ্বের সন্ত্রাস দমনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, প্রায় নব্বইভাগ ক্ষেত্রে নিরীহরাই এর স্বীকার। এর থেকে বেশি বলা গেল না।

সবচেয়ে বড় কথা, এত কিছু হবে অন্যের স্বার্থে। আইনের ভাষায় সেই বিজাতীয় স্বার্থের ল্যাঞ্জাটা লুকানোর দরকারও আইন প্রণেতারা বোধ করেন নাই। সংক্ষেপে বলি:

১. ভারত প্রজাতন্ত্রের সুরক্ষা: আইনে সন্ত্রাসী কার্য বলতে ‌’বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের’ ওপর আঘাতে কথা বলা হলেও প্রয়োগের ধারাগুলোতে দিব্যি ‘বাংলাদেশ’ রিপ্লেসড হয়েছে ‘অন্য কোনো প্রজাতন্ত্র’ কথাটার দ্বারা। আমেরিকা হলে কেবল রাষ্ট্র কথাটাতেই চলতো, কিন্তু এ অঞ্চলে ‘অন্য প্রজাতন্ত্র’ তো একটাই: মহামহিম ভারত। আইনের ৬ ধারার ‘সন্ত্রাসী কার্যের’ সংজ্ঞার শুরুতে একবার মাত্র ‘বাংলাদেশ’ শব্দটা থাকলেও বাকি উপধারায় সেই ‘অন্য প্রজাতন্ত্র কিংবা অন্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা, অন্য ব্যক্তি’দের সদম্ভ উপস্থিতি। বুঝতে বাকি নাই, সখি তুমি কার?

২. দেশি সম্পদ ও জীবনের থেকে বিদেশি সম্পদ ও জীবনের দাম বেশি: দেশের গাড়ি ভাংলে বা কোনো স্থাপনায় ঢিল মারলে যদি ২-৩ বছরের শাস্তি হয়, ‘অন্য কোনো ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের’ ক্ষতি করলে বা করার চিন্তা করলে বা আক্রমণাত্মক কথা/অভযেোগ করলে ন্যুনতম সাত বছর থেকে মৃত্যুদণ্ডপর্যন্ত শাস্তি! সঙ্গে সম্পত্তি ক্রোকের বোনাস। ব্রিটিশ আমলেও এই বিধান ছিল না।

৩. সার্বভৌম কপি পেস্ট শিল্প: আজকের প্রথম আলোয় মিজানুর রহমান খান বিস্তারিত লিখেছেন যে বিপদটা কোথায়। বাড়তি কথা এই, আইনের ভাষাটা ভারতের সন্ত্রাস দমন আইন UAPA থেকে মোটামুটি কপি পেস্ট করা। সেটা করতে গিয়েই সম্ভবত ‘প্রজাতন্ত্র’ সহ সেই প্রজাতন্ত্রের আইনের মেলা ধারা-উপধারা বাংলা অনুবাদে ঢুকে পড়েছে। আইন স্বার্থের রক্ষক, আইনই প্রমাণ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন কার স্বার্থের রক্ষক!!! জয় বাংলা!

৪. কার যুদ্ধ কে লড়ে? চ উপধারায় লেজ নাচিয়েই বলা হয়, ‘কোন সশস্ত্র সংঘাতময় দ্বন্দ্বের বৈরি পরিস্থিতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন নাই এইরূপ কোন বেসামরিক, কিংবা অন্য কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাইবার বা মারাত্মক কোন শারীরিক জখম ঘটাইবার অভিপ্রায়ে কোন কার্য করে’ কোনো জনগোষ্ঠীকে ভীতি প্রদর্শন বা কোন সরকার বা রাষ্ট্রকে…বিরত থাকিতে বাধ্য করে’ ??? প্রশ্ন হচ্ছে, এইটা তো যুদ্ধমান কোনো রাষ্ট্রের বেলায় প্রযোজ্য, সেই রাষ্ট্র এখন কারা? যুক্তরাষ্ট্র-ভারত নয় কি?

৫. টর্চারের আউটসোর্সিং: এই আইনের বলে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের ‘শত্রু’কে বাংলাদেশে এনে নির্যাতন, বিচার, হত্যা পর্যন্ত করা যাবে। আমরা এভাবে প্রভুর হাবিলদারির কাজে নিযুক্ত হলাম। তাদের দেশে মানবাধিকার ইত্যাদির জন্য যাদের বিচার বা নির্যাতন কঠিন হবে বা ব্যয়বহুল হবে, আমাদের সস্তা শ্রমের মতো আমাদের সস্তা সার্বভৌমত্ব তাদের নিকাশে না লাগলে কীসের বন্ধুপ্রতিম আমরা? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগ্রাসনী বুলডোজার যাতে কোনো সীমান্তিক ঝাঁকুনি ছাড়াই মসৃণভাবে বাংলাদেশের সমাজ-রাষ্ট্রের ওপর দিয়ে চলতে পারে, তারজন্য এখানকার আইন-প্রশাসন-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে বহুদিন থেকে। এই আইন বাংলাদেশে বিদেশিদের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের রক্ষাকবচ। খনিজ, গ্যাস, অরন্য এবং মানুষের ওপর তারা যা খুশি করবে, প্রতিবাদ করতে গেলে আপনি হবেন সন্ত্রাসী। তার ওপর ক্ষমতায় আছেন আবার একজন ফুল এক হাফ আর এক সেমি ‘বামপন্থি’। এইসব ঝাণ্ডু বাম প্রকৃত বামকে বলে হঠকারি।

একশ্রেণীর সুশীল নিরাপত্তার জুজুর ভয়ে ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা বিসর্জনে আগ্রহী। এদের স্বাধীনতার চেতনা বায়বীয়। এই আইন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থি, এই আইন শহীদদের আত্মদানের সঙ্গে বেইমানি। অথচ বাংলাদেশের তরুণ তুর্কিদের হুশ নাই। ব্লগাররা আটক, শাহবাগ নিস্তেজ। জাতীয় ঐক্য বলে কিছু নাই। জনগণ দিশাহীন। নতুন আইনে সাইবার কণ্ঠ দমনের বন্দোবস্ত পাকা হচ্ছে, অথচ সাইবার যোদ্ধারা কচুবনে তরোয়াল চালিয়ে হয়রান। ডিজিটাল বাংলাদেশের আসল চেহারা যখন বেরিয়ে পড়লো, তখন আমাদের ডিজিটাল মহানায়কেরা কী একটা গা ঝাড়া দেবেন?

তথ্যসূত্রঃ ফেসবুক

Advertisements
বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও………

বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও………

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ISlam

শিরোনাম দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি কোন রোমান্টিক লেখা লিখতে বসিনি। আমি আপনাদের আজ মুসলিমদের এমন কিছু ব্যাথাতুর গল্পের পাণ্ডুলিপি শুনাব যা যুগে যুগে মুসলিমদের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরিয়েছে। যে ব্যথায় ব্যথাতুর হয়ে মুসলিমরা আল্লাহ্‌র দ্বীনকে ভালবাসতে শিখেছে। আল্লাহ্‌র জন্য জীবন দিতে শিখেছে। আসুন গল্প শুরু করি……

হযরত হানযালা (রাঃ)। চিনতে পারছেন না তাইতো?? তিনি একজন সাহাবী ছিলেন। ঘটনাটা উহুদ যুদ্ধের আগে। তখন নিয়ম ছিল যুদ্ধের আগের দিন মুজাহিদদের বেস ক্যাম্পে থাকতে হত। কিন্তু যুদ্ধের আগের দিন হযরত হানযালা (রাঃ) এর বিয়ে হয়। আগামীকাল উহুদের যুদ্ধ আর আজ হানযালার বাসর! রাসুল (সাঃ) তাকে বেস ক্যাম্প থেকে ছুটি দেন তার বিয়ে উপলক্ষে। পরদিন সকাল বেলা জিহাদের ডাক আসলে হানযালা তড়িঘড়ি ঘরে আল্লাহ্‌র রাস্তায় জিহাদে বেড়িয়ে পড়েন। কোন সঙ্কোচ নেই, কোন থমকে যাওয়া নেই! নববধূর চোখের পানি ছিল কিনা জানিনা কিংবা থাকলেও সেটা হানযালাকে আটকাতে পারেনি। যে মানুষটা বিয়ে করেছে সে হয়ত বুঝতে পারবে বিয়ের পরের মুহূর্তগুলো একজন মানুষের জীবনে কতো আনন্দের, কতো আকাঙ্ক্ষিত। মনে হবে এই সময়গুলো যেন সারাজীবন ধরে চলতে থাকে……
এধরণের একটা মুহূর্ত থেকে হানযালা উহুদের যুদ্ধে গিয়েছিলেন। এবং সুবাহানাল্লাহ তিনি এত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন যে এক পর্যায়ে তিনি কাফেরদের দলপতি, নিরাপত্তায় বেষ্টিত আবু সুফিয়ানকে হত্যার কাছাকাছি চলে যান। কিন্তু কঠিন নিরাপত্তাবলয় ভাঙতে গিয়ে তিনি শহীদ হন।

আমরা ইসলামপন্থীরা কথায় কথায় মুসলিম উম্মাহ শব্দটা ব্যবহার করি। আমরা সবাই মনে করি আমরা উম্মাহর জন্য চিন্তিত। আমরা উম্মাহ রক্ষার কাজ করছি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে উম্মাহ বলতে আমরা আসলে কি বুঝি!! উম্মাহ কষ্টে থাকবে, উম্মাহর রক্ত ঝরবে, উম্মাহ উদ্বাস্তু হবে, উম্মাহ আল্লাহ্‌র জমিনে গিনিপিগ হয়ে থাকবে আর আমরা উহ্, আহ্, হায় হায় রব তুলে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস ছবি শেয়ার দিয়ে উম্মাহর প্রতি আমাদের দায়িত্ব পরিপূর্ণ করব?? আসলেই এরকম কিনা সেই চিন্তার ভার আপনাদের দিলাম, আমার লেখার উদ্দেশ্য আপনাদের উম্মাহর প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলা নয়। আমি আল্লাহ্‌র রাস্তায় কষ্টের পাথর বুকে চেপে নিশ্চুপে, নিভৃতে আল্লাহ্‌র কাজ করে যাওয়া আমার মুসলিম ভাই বোনদের কিছু কথা আপনাদের জানাতে চাই।

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা তদবির করে তার জামিন হয়। কিন্তু জামিন নিয়ে বের হওয়ার সময় জেলগেটে বেচারাকে আবারো আটক করা হয়। সে আমার সরাসরি বন্ধু না। আমার আরেক বন্ধুর মাধ্যমে তার সাথে আমার পরিচয়। সে জেলে থাকার সময় আমার সেই বন্ধু বলতেছিল, জীবনটা কি অদ্ভুত তাইনা?? ক্লাস হচ্ছে, পরীক্ষা হচ্ছে, ল্যাব হচ্ছে, আমরা সেসব নিয়া ব্যস্ত, টেনশন করছি আর আমার বন্ধুর কাছে কি এসবের কোন অর্থ আছে?? ভুল হোক শুদ্ধ হোক সে আল্লাহ্‌র রাস্তাতেই তো কাজ করতে গিয়ে জীবনের কিছু সংজ্ঞা অন্যভাবে ভাবছে। একটাই জীবন অথচ কি বৈপরীত্য আমাদের এক একজনের চিন্তায়। যেদিন আমার খুব কাছের এক ভাই আটক হল এর পরের দিন আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ছিল। ঐদিন রাতে আমার ঘুম হয়নি। পরদিন পরীক্ষার হলে লেখা শেষ করে কেমন একটা আনমনা হয়ে বসে আছি তখন ম্যাডাম জিজ্ঞেস করল আমি ঠিক আছি কিনা! পরীক্ষার হলে আমার চারপাশের ছেলেমেয়েগুলোকে দেখছিলাম খুব আগ্রহ নিয়ে। এদের সবাইকে আমি চিনি। এরা সবাই ক্যাম্পাসে সারাদিন অনেক হৈ হুল্লোড় করে। চঞ্চলতা, বন্ধু আড্ডা গান লেগেই থাকে এদের প্রতিটা দিনে। কিন্তু পরীক্ষার হলে চিত্রটা কতো ভিন্ন। টেনশনে এক একটা মুখ শুকিয়ে কিম্ভূতকিমাকার দেখাচ্ছে। কারো দুই তিন মার্ক্সের একটা প্রশ্ন হয়তো ছুটে গেছে, কেউ হয়তো একটা উত্তর ভুল লিখেছে, কারো হয়তো পরীক্ষার হলে খাতা দশ মিনিট রেখে দিয়েছে…… টেনশন…… আক্ষেপ…… আফসোস!! এদের কাছে আমার বন্দী ভাইয়ের কোন গুরুত্ব নেই! রিমান্ডে নির্যাতিত দাড়িওয়ালা হুজুরের কথা এরা জানেনা, কারাগারের চারদেয়ালে বন্দী দাঁড়ি মুখের শান্ত চেহারার তরুণ ছেলেগুলোর বুকের সুখ সুখ ব্যথা এরা কোনদিন অনুভব করতে পারবে না। কোনদিন না। আফসোস……

পৃথিবীর প্রতি প্রান্তে প্রান্তে আমার মুসলিম ভাই বোনেরা অনেক কষ্টে আছে ভাই। অনেক কষ্টে। আপনি কি কোনদিন অনুভব করেছেন কতো তীব্র সেই কষ্ট?? একটা প্রশ্ন করি?? উম্মাহর ঐক্য কি?? উম্মাহর ঐক্য মানে এই না যে আমরা সবাই ফটোকপি হব, সবাই এক হব। নিজেদের মধ্যে মতের অমিল রাসুল (সাঃ) সময় থেকেই ছিল এটা সারাজীবন থাকবে। উম্মাহর ঐক্য হল তখন যখন আপনার এক মুসলিম ভাইয়ের কষ্টে আপনি ব্যথিত হবেন। যখন আপনার মুসলিম ভাই বোনের চোখের পানি দেখে মনের অজান্তেই আপনি কেঁদে ফেলবেন। যখন আপনার কোন ভাইয়ের বিপদের কথা মনে করে খেতে বসে আপনার গলায় খাবার আটকে যাবে। যখন আপনি আল্লাহ্‌র কাছে কেঁদে কেঁদে বলবেন, হে আল্লাহ্‌ আমার ভাইকে রক্ষা কর, আমার বোনকে রক্ষা কর। This is the way you feel the ummah my dear brothers. This is the way…….

আমরা প্রতিদিনই শুনি এতজন গ্রেফতার হয়েছে। প্রতিদিনই শুনি গুয়ান্তনামো, আবু গারিবের মত কারাগারে আমাদের ভাই বোনেরা নির্যাতিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনদিনও আমার ভাইটির কথা ভাবিনা তার পরিবারের মত করে। তার মা বাবার কতো টেনশন। তার স্ত্রীর কি কান্না। তাদের বাসায় হয়তো রান্নাই হয়নি, ছোট ছোট বাচ্চাগুলো কাঁদতে কাঁদতে হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। মমতাময়ী মা, প্রিয় স্ত্রী, বা, ভাই বোন সবার চোখ নির্ঘুম আর শঙ্কা। বন্দী হওয়া ছেলেটা হয়তো বেঁচে ফিরবে কিংবা শহীদ হয়ে। এরকম অসংখ্য ত্যাগের পাণ্ডুলিপি দিয়ে ইসলামের বিজয়ের গল্প সাজানো হয়েছে। অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া জান মালের বিনিময়ে আল্লাহ্‌ কিছু মানুষকে তার প্রিয় বান্দা হিসেবে পছন্দ করেছেন।

আমি মুসলিমদের উপর নির্যাতনের কথা আসলেই ইরাকে আমাদের বোন ফাতেমার কথা বলি। এই বোন তার মুসলিম ভাইদের উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি লিখেছিল। আবু গারিব গারাগারে অন্য মুসলিম বোনদের সাথে আমেরিকান কুত্তাদের দ্বারা দিনে নয়বার ধর্ষিত হওয়ার কষ্ট বুকে চেপে এই বোন তার মুসলিম ভাইদের কাছে লেখা চিঠি শুরু করেছে কিভাবে জানেন?? সে শুরু করেছে এভাবে,
“বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইছি। পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

ক্বুল হু ওয়াল্লাহু আহাদ (বল আল্লাহ এক)
আল্লাহুস সমাদ (আল্লাহ অমুখাপেক্ষী)
লাম ইয়ালিদ (তিনি কাউকে জন্ম দেননি)
ওয়ালাম ইউলাদ (না তাঁকে কেউ জন্ম দিয়েছে)
ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ (তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই) – সুরা ইখলাসঃ ১-৪

আমি শুরুতে এই সুরার উদ্ধৃতি দিলাম, কেননা আমি মনে করি মহান আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরার জন্য এই সুরাটিই সবচেয়ে ভালো, আর মুমিনদের অন্তরে এই সুরাটি দৃঢ়ভাবে গেঁথে আছে।”
সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবর! চরম কষ্টের মুহূর্তেও এই বোন আল্লাহ্‌র গুণগান গাইতে ভুলেনি। এ কি আপনার আমার মুসলিম বোন নয়? আল্লাহ্‌ এদের মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষা করছেন। আল্লাহ্‌ এদের উপর যে অসহ্য যন্ত্রণা দিয়েছেন এতে আস্থা রাখা বোনদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে অফুরন্ত পুরষ্কারের ডালি অপেক্ষা করছে ইনশাআল্লাহ। এই ব্যথা , এই যন্ত্রণা হাজারগুণ আনন্দের উপলক্ষ হয়ে তাদের কাছে ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ। ইরাকে আমার মুসলিম বোনদের ক্রমাগত ধর্ষণের কিছু প্রসেসের গল্প শুনবেন?? আমি মেয়ে নই, আমি ছেলে। তারপরও এই আর্টিকেলটা আমি দুই প্যারার বেশী পড়তে পারিনি। আমার সেই সাহস হয়নি। এরা আমাদের বোন, এরা আমাদের মুসলিম ভাইদের স্ত্রী, কারো মা! পড়ে দেখুন এবং ভাবুন……

http://www.globalresearch.ca/the-dark-and-secret-dungeons-of-iraq-horror-stories-of-female-prisoners/5313974

হযরত বিলাল (রাঃ) আমার খুব প্রিয় একজন সাহাবী। তাঁর উপর মুশরিকদের অত্যাচারের বিবরণ নতুন করে বলার কিছু নেই। ইসলাম গ্রহণ করার পর যে সাতজন প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহনের কথা ঘোষণা করেছিলেন হযরত বিলাল তাদের একজন অথচ তিনি ছিলেন একজন দাস। তাঁর উপর সীমাহীন অত্যাচার করা হবে এটা তিনিও জানতেন, তাকে প্রটেক্ট করার জন্য কেউ নেই সেটাও জানতেন। কিন্তু ঈমানের কি শক্তিমত্তাই না তিনি দেখিয়েছিলেন! মরুভুমির উত্তপ্ত বালিতে বুকে পাথর চাপা দিয়ে শুইয়ে রাখা বিলালের পেছন দিক ঝলসে যাওয়া দেখে এক কাফের ব্যঙ্গ করে বলল, তোমার পেছনদিক সত্যিই খুবই কুৎসিত দেখাচ্ছে! নিশ্চয় এই দিনগুলোই তোমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন। জবাবে বিলাল বললেন, আল্লাহর কসম! এই দিনগুলোতেই আমি ঈমানের মিষ্টতার স্বাদ পেয়েছি!

ইসলামে সীমাহীন অত্যাচার আর ঈমানের পরীক্ষা দিয়েছেন যারা হযরত বিলাল তাদের মধ্যে অন্যতম। তার প্রতিদানও আল্লাহ্‌ তাকে দিয়েছেন। সহিহ ইবন খুযাইমা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, একদিন রাসুল (সঃ) বিলালকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “বিলাল, কিসের বদৌলতে তুমি আমার আগেই জান্নাতে পৌঁছে গেলে? গতরাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করে তোমার খশখশা আওয়াজ শুনতে পেলাম।”

মুমিনদের কষ্টের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ্‌ কুরআনে সূরা ইনশিরাহতে বলেছেন, “নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।” [সূরা ইনশিরাহঃ ৫]

মক্কার কাফেরদের সীমাহীন অত্যাচার আর সইতে না পেরে মুসলিমরা মদিনায় হিজরত করেছিল। নিজের ঘর বাড়ী, ধন সম্পত্তি সব ছেড়েছিল। শুধু আল্লাহ্‌র জন্য, শুধু ইসলামের জন্য। সব হারানোর বেদনা এদেরকে কোনদিন আল্লাহ্‌র রাস্তা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। হযরত সুহাইব ইবন সিনান আর রুমি (রাঃ) এই বেচারা আরবের বাইরে থেকে এসে মক্কায় প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। সবাই হিযরত করে মদিনায় চলে গেলেও তিনি যেতে পারলেন না। কুরাইশরা তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতো। উনি যাতে কোনভাবে পালাতে না পারে। একদিন কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন আর এটা জানতে পেরে কুরাইশরা তার পিছু নিল। তারা বলল মক্কায় যে ধন সম্পদ অর্জন করেছে সেই সম্পদ নিয়ে তারা তাকে যেতে দেবে না। তখন সিনান আর রুমি সহজ ভাবেই বলল, “আমি যদি আমার সব ধন সম্পদ তোমাদের হাতে তুলে দেই তাহলে কি তোমরা আমাকে যেতে দেবে?” তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ! সিনান আর রুমি তার সবকিছু তাদের হাতে তুলে দিলেন শুধু এজন্য যে তারা তাকে মক্কা থেকে মদিনায় যেতে দেবে! সুবাহানাল্লাহ! তার এর ত্যাগের জন্য রাসুল (সাঃ) তাকে দেখেই তিনবার বলেছিলেন, “নিশ্চয় ব্যবসা লাভজনক হয়েছে”।

হিযরতের পর মদিনায় মুহাজিরদের চাপে অর্থনৈতিক ভিতটা নড়ে উঠেছিল। চরম আর্থিক দুর্গতি দেখা দেয়। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এরকম চরম কষ্টের সময়ও মুসলিমরা জিহাদে অংশগ্রহণ করত। তাদের এই চরম কষ্টের সময়গুলো সম্পর্কে হযরত সা’দ বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতাম; অথচ তখন গাছের পাতা ছাড়া আমাদের খাওয়ার কিছুই থাকতো না। (তা খেয়েই আমরা জীবন ধারণ করতাম) আর আমাদের বিষ্ঠা হত উট ছাগলের বিষ্ঠার মত”।

কষ্ট, হারানোর বেদনা, বিপদ এসব মুমিনের নিত্যসঙ্গী। আল্লাহ্‌র রাসুল (সঃ) সারাজীবন কষ্ট করেছেন। সাহাবারা সারাজীবন কষ্ট করেছেন। যুগে যুগে আল্লাহ্‌র রাস্তায় মুমিনরা সীমাহীন দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন, এখনো তাই। কুরআনে আল্লাহ্‌ এসব নির্যাতিত, বিপদে পতিত মুমিনদের অবিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন,

“যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে যান”। [সূরা বাকারাঃ ২৫৭]

আল্লাহ্‌ এই মানুষগুলোকে তার প্রিয় বান্দা হিসেবে পছন্দ করেছেন। তাদেরকে কল্যাণ দান করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, “মহান আল্লাহ্‌ যে ব্যক্তির কল্যাণ চান তাকে বিপদে পতিত করেন”। (বুখারি)

হযরত আবু সাইদ ও আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলিম বান্দার যেকোনো ক্লান্তি, নিত্য ব্যাধি, দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, দুঃখ- কষ্ট ও অস্থিরতা হোক না কেন, এমনকি কোন কাঁটা ফুটলেও তার কারণে মহান আল্লাহ্‌ তার গুনাহসমুহ মিটিয়ে দেন”। (বুখারি, মুসলিম)

কাফের, মুশরিক আর ইসলামের শত্রুদের অত্যাচার, জুলুমের মাঝেও মুমিনদের জন্য সুসংবাদ আছে। আল্লাহর পুরষ্কার আছে। হক্ব আর বাতিলের চিরায়ত দ্বন্দ্বে আল্লাহর কাছে কার পরিণতি কি সেটা সূরা বুরুজের দুইটা আয়াত দিয়ে বলে দেওয়া যায়। আল্লাহ্ বলছেন,

“যারা মুমিন পুরুষ ও নারীকে নিপীড়ন করেছে, অতঃপর তওবা করেনি, তাদের জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আছে দহন যন্ত্রণা,” [সূরা আল বুরুজঃ ১০]

“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় নির্ঝরিণীসমূহ। এটাই মহাসাফল্য।” [সূরা আল বুরুজঃ ১১]

 

 অত্যাচারিত বিলাল, আম্মাররা আল্লাহর মেহমান হয়। এরা মরেও বেঁচে থাকে। যুগ যুগ ধরে এদের উত্তরসূরিরা বেঁচে থাকে। ইমাম মালিক, আহমদ ইবন হাম্বল থেকে ইবন তাইমিয়া, সাইদ কুতুব, আওলাকি কেউই মরেনি। কাফেররা তাদের মারতে পারেনি। শহীদের রক্ত কখনো শুকায়না। মজলুমের আর্তনাদ বহুগুণ বিধ্বংসী হয়ে জালিমের কাছে ফিরে আসে। অবশ্যই ফিরে আসে। একদিন সময় আসবে, আলবৎ আসবে……

দোয়া করবেন সবাই। অনেক অনেক দোয়া। আমার ভাইদের জন্য দোয়া। আমার ভাইদের জন্য ভালোবাসা।

আউফ ইবনে মালিক আশযায়ী (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে বললেন,
“হে রাসুলুল্লাহ (সা), কাফিররা আমার ছেলেকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছে আর তাতে আমার স্ত্রী বিচলিত হয়ে আছে, আপনি এ ক্ষেত্রে আমাকে কি উপদেশ দিবেন?”

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, “তোমার স্ত্রী এবং তোমার জন্য আমার উপদেশ হল তোমরা ঘনঘন – “ লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াআ ইল্লা-বিল্লা-হি” বলতে থাক” ……………… ”

হাদিসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন।

ইনশাআল্লাহ্ আমরা আমাদের মুসলিম ভাইদের জন্য দোয়া করব বেশী বেশী। মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করব, চিন্তা করব এবং অবশ্যই কাজ করব ইনশাআল্লাহ।

শেষকথাঃ কষ্টের মুহূর্তগুলোতে আমার খুব প্রিয় একটা হাদিস আছে। হযরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইব ইবন সিনান (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সঃ) বলেছেন, “মু’মিনের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। তার সকল কাজই কল্যাণময় তার আনন্দময় কিছু হলে সে আল্লাহ্‌র শোকর আদায় করে, তাতে তার কল্যাণ সাধিত হয়। আবার তার দুঃখজনক কিছু হলে সে আল্লাহ্‌র ওপর ধৈর্যধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর”। (মুসলিম)

কাফের, তাগুতের অত্যাচারে আমরা হতাশ হই, কষ্ট পাই। তখন আমাদের মনে রাখা উচিত আল্লাহ্‌ আমাদেরকে তার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্য থেকে খুবই সৌভাগ্যবান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তার জমিনে আমাদেরকে তার দ্বীন কায়েমের জন্য বাছাই করেছেন যে পথে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আমাদের ঘিরে ধরে। আমাদের মনে রাখা উচিত এই বেদনার মুহূর্তগুলো আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এই রহমত আমাদের আখিরাতকে মধুর সময়ে ভরিয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ। আমরা হতাশ হবো না। ধৈর্য হারাবো না। আল্লাহ্‌র উপর আস্থা রাখবো। মুমিনদের প্রতি আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি কখনো মিথ্যে হবার নয়। তালেবান প্রধান মোল্লা উমর ২০০১ সালে একটা কথা বলেছিলেন। সেই কথাটাই আমার প্রিয় ভাই বোনদের জন্য সর্বশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে দিয়ে গেলাম…..

“I am considering two promises. One is the promise of Allah, the other of Bush. The promise of Allah is that my land is vast…the promise of Bush is that there is no place on Earth where I can hide that he won’t find me. We shall see which promise is fulfilled.”

একদিন আমাদেরও সময় আসবে কাফেরদের টুটি চেপে ধরার। অবশ্যই আসবে ইনশাআল্লাহ। সেদিনের আগপর্যন্ত তোরা ঠিকে থাক। হাল ধরে থাক। ভয়ংকর ঝড় সব এলোমেলো করে দেবে কিন্তু একদিন আমরা তীরে পৌঁছব ইনশাআল্লাহ। আলবৎ পৌঁছব……

 

সূত্রঃ আনিকা ওয়ার্দা তুবা, ফেসবুক

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কঃ যে সমীকরণ আজও মেলেনি

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কঃ যে সমীকরণ আজও মেলেনি

নিচের কয়েকটা লাইন পড়লেই বুঝতে পারবেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল চেহারা। তার পরেও আমাদের মন্ত্রীরা এখনো ভারতীয় দাদা বাবু বলতে অজ্ঞান। কবে যে তাদের হুশ হবে সেটা মহান আল্লাহ্‌ পাক-ই জানেন।

india-bangladesh-flag_2

১/ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতকে ইতিমধ্যেই স্থল ও নৌ ট্রানজিট প্রদান করা হয়েছে। এতে করে সেভেন সিস্টার্সে যাবার জন্য ভারতের যানবাহনের জ্বালানী খরচ কমেছে ক্ষেত্রভেদে ৮৫% হতে ৫৮% এবং সময় কমেছে ১৬ ঘন্টা। অথচ বিনিময়ে আমরা তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা তো পাই নি, উল্টো ৩৪ টি নদীতে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে পানিশূন্য করা হচ্ছে।

২/ বাংলাদেশের সুন্দরবন ধ্বংশ করার জন্য ভারতে নিষিদ্ধ কোম্পানী এনটিপিসি’কে রামপালে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। জমি বাংলাদেশের, ৮৫% মূলধন বাংলাদেশের, অথচ মাত্র ১৫% মূলধন হিসেবে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে ভারতীয় এই কোম্পানী লাভের ৫০% শেয়ার পাবে!

৩/ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা থেকে উত্তরণে বিদ্যুৎ ভারত বিদ্যুৎ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা আজো আলোর মুখ দেখেনি।

৪/ একাধিক চুক্তি হওয়ার পরও ছিটমহল বিনিময় দিচ্ছে না ভারত। দোহাই দেয়া হচ্ছে ভারতের সংসদ ও আইনের। অথচ বাংলাদেশ চুক্তি মোতাবেক সকল ছিটমহল ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে।

৫/ সীমান্ত হত্যা এখনো বন্ধ করেনি ভারত সরকার। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মৃত্যু নিশ্চিতের জন্য এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে মেটাল বুলেট।

৬/ বাংলাদেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেল ভারতে দেখা না গেলে তাদের প্রতিটি এখানে চলছে বহাল তবিয়তে। এমনকি এখানকার বিজ্ঞাপন প্রদান বাবদ তারা কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে নিজ দেশে।

৭/ শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির সুযোগ পেলেও অশুল্ক বাধা আরোপ করে এ প্রক্রিয়াকে পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

৮/ টিপাইমুখ বাঁধসহ অভিন্ন নদীর পানিবন্টন সমস্যার সমাধান হয়নি এখনো।

৯/ আইটি খাতেও ভারতের বিনিয়োগ ও আধিপত্য বাড়ছে। দেশের পর্যটন ও হোটেল ব্যবসা ধীরে ধীরে ভারতের হাতে চলে যাচ্ছে।

১০/ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই নারায়নগঞ্জে নদী বন্দর নির্মানের টেন্ডার ডেকেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।

তারপরও এখন বাংলাদেশ সরকার ভারতকে তার সেভেন সিস্টার্সের জন্য টেলি করিডোর দিতে যাচ্ছে এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানীর জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পাইপ লাইন বসানোর অনুমতি দিতে যাচ্ছে। মেরা ভারত মহান।
—————————-

1/ http://www.mzamin.com/details.php?nid=NTc1OTI%3D&ty=MA%3D%3D&s=MTg%3D&c=MQ%3D%3D
2/ http://www.amadershomoy2.com/content/2013/06/07/middle0881.htm

তথ্যসূত্রঃ একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

ইন্টারনেটে ঠিকমতো বাংলা পড়তে বা লিখতে পারছেন না?

ইন্টারনেটে ঠিকমতো বাংলা পড়তে বা লিখতে পারছেন না?

ফেসবুক বা ব্লগে যারা বাংলায় লেখালেখি করেন, কিংবা যারা অনলাইনে বাংলা সংবাদপত্র পড়েন ও টুকটাক কমেন্ট, টমেন্ট করেন তাদের জন্য সমস্যাটা একেবারে নিত্যকার। মাঝে মাঝেই পরিচিতজনের মাঝে অনেকেই এই সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আসেন আমার কাছে। আমিও কিছু মনে করিনা। হাসি মুখে তাদের সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করি। সব সময় যে পারি সেটাও না। তবে আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি। যারা মজিলা ফায়ারফক্স ব্যবহার করেন তাদের জন্য আমার আজকের টিপস। নিচের সহজ ৫ ধাপে সমাধান করে নিন বাংলা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান।

প্রথম ধাপঃ আপনার মনিটরের বাম পাশের কোণায় দেখুন ‘Firefox’ লেখা আছে। ওখানে একটা ক্লিক করুন।

1

দ্বিতীয় ধাপঃ মেনুবার থেকে ‘Options’ মেনুতে ক্লিক করুন2

তৃতীয় ধাপঃ পাশে দেখানো নির্দেশনা অনুসারে ‘Advanced’ অপশনে ক্লিক করুন।

3

চতুর্থ ধাপঃ নিচের নির্দেশনা অনুসারে ‘Default Character Encoding’ এর মান ‘Unicode (UTF-8)’ সেট করুন।

4

পঞ্চম ও সর্বশেষ ধাপঃ Ok বাটনে ক্লিক করে বেরিয়ে আসুন এবং ফায়ারফক্স রিস্টার্ট করুন। আশাকরি আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এর পরেও যদি সমস্যা থাকে তাহলে কমেন্ট আকারে যোগাযোগ করুন।

একটি ডিজিটাল স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, অতঃপর ………

একটি ডিজিটাল স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, অতঃপর ………

সবে ঘুম থেকে উঠলাম কিন্তু চোখে এখনো জড়িয়ে আছে ঘুমের স্পষ্ট ছাপ। কয়টা বাজে দেখার জন্য বালিশের নিচে থেকে মোবাইলটা বের করবো বলে হাত চালালাম। এসব বাজাবাজির ব্যাপারগুলোতে অবশ্য ঘড়ির ওস্তাদি ছিলো বহুদিন থেকেই। কিন্তু মোবাইল নামক আজব এই বস্তুটার আগমনের সাথে সাথে সব কেমন যেন বদলে গেল। ক্যালকুলেটর, ঘড়ি থেকে শুরু করে স্টপওয়াচ পর্যন্ত সবকিছুর বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দিয়ে সর্বেসর্বা হয়ে দাড়ালো এই মোবাইল। কিন্তু একি! আমার মোবাইলটা তো খুঁজে পাচ্ছিনা। হায় হায়! মোবাইল হারালে তো মহাবিপদ হয়ে যাবে, বালিশ উঁচু করে দেখলাম, বালিশের ভিতরে দেখলাম, কোথাও নেই মোবাইলখানা। তাড়াতাড়ি বাইরের গেটে গিয়ে দেখি সেখানে তো তালা দেওয়াই আছে, রুমের জানালাগুলোও তো লক করা। তাহলে মোবাইলটা হারাবে কোথায়? সারা বাড়ি তন্ন-তন্ন করে খুজলাম, কিন্তু মোবাইল বাবাজীর সন্ধান পেলাম না।

2010_tron_legacy_2-1920x1200

মন খারাপ করে বিছানার উপরে বসে আছে এমন সময় আমার নজর আটকে গেল বিছানার পাশে রাখা একটা বস্তুর উপর। বস্তুটা আগে যে কখনো দেখিনি এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কাছে এসে হাতে তুলে নিলাম বস্তুটাকে। খুব বেশি ওজনদার না, পিছনে একটা আধা খাওয়া তরমুজের স্টিকার মারা। বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠলাম জিনিসটা নিয়ে। কিন্তু অনেক্ষন নাড়াচাড়া করেও কোন কূলকিনারা করতে পারলাম না। যতোটুকু বুঝলাম তা হলো, এটা একটা ইলেকট্রনিক যন্ত্র। জিনিসটার নিচের দিকে চারকোনা একটা চিহ্ন দেখতে পেলাম, মনে হয় কোন সেন্সর-টেন্সর হবে। কিন্তু কিসের সেন্সর এটা? ফিঙ্গারপ্রিন্ট? দুই হাতের সব গুলো আঙ্গুল দিয়ে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন লাভ হলো না। বুঝতে পারলাম এটা ফিঙ্গারপ্রিন্ট না। আরেকটু ভালো ভাবে খেয়াল করার জন্য সেন্সরটা চোখের কাছে নিয়ে আসলাম। কয়েক সেকেন্ড পরেই খুব উজ্জ্বল একটা আলোর ঝলকানিতে আমার চারপাশ ঘোলাটে সাদা হয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরেই অবশ্য সবকিছু স্বাভাবিক গেল, কিন্তু স্বাভাবিক হবার পরে দেখি বস্তুটা নড়ে চড়ে উঠেছে। সেটার পর্দায় লেখা উঠেছে,

“শুভ সকাল, রবিন সাহেব! তরমুজ টেলিকমের ভূবনে আপনাকে স্বাগতম। আপনার পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চিত করার জন্য দয়া করে পর্দার উপরে বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলির ছাপ দিন।”

তার মানে ওটা ছিলো রেটিনা সেন্সর! যাইহোক, বেশ মজা পেলাম লেখাগুলো পড়ে। তরমুজ টেলিকম! বেশ মজারতো কোম্পানিটা! নাম যেহেতু আমারই দেখছি, তাহলে জিনিসটাও মনে হয় আমার জন্যই লেখা হয়েছে। তাই বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলিটা একটু ছোয়ালাম বস্তুটার পর্দার উপরে। আঙ্গুলের ছাপ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবার পরে বস্তুটা চালু হলো। বেশ অবাক হয়েই বস্তুটাকে দেখছি কিন্তু সবকিছুই নতুন। কোথা থেকে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। উপরের এক কোনায় মনে হয় তারিখ দেখাচ্ছে। কিন্তু একি! তারিখ বলছে আজ ২৩ অক্টোবর ২০২১! বলে কি?

গতকাল রাতে না ঘুমালাম, কতো তারিখ ছিলো গতকাল? ২৮ মে, হ্যা ঠিকই তো, ২৮মে, ২০১৩। মাত্র একরাতে আটবছর কিভাবে পার হবে? মগের মুল্লুক নাকি এসব? বস্তুটা ফেলে আমার পড়ার রুমে গেলাম। ওখানে আমার কম্পিউটারটা রয়েছে। গুগলে একটা সার্চ দিলেই সব জবাব পাওয়া যায়, তাই গুগল ব্যাটারেই জিজ্ঞেস করবো ভাবছি। কিন্তু একি! আমার কম্পিউটারও তো হাওয়া। বেশ তাজ্জব হয়ে গেলাম ঘটনার পরিক্রমায়। ফিরে এলাম আমার রুমে, বস্তুটা আবার হাতে তুলে নিলাম, নাড়াচাড়া শুরু করে দিলাম। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই বুঝে গেলাম যে এটা টাচ ইন্টারফেস অর্থাৎ, আঙ্গুলের ছোঁয়ায় পরিচালনা করতে হয়। শত শত প্রোগ্রামে গিজগিজ করছে বস্তুটার ডেস্কটপ। সেখান থেকে বহু খোঁজাখুঁজির পরে একটা ইন্টারনেট ব্রাউজার বের করলাম। উপরের ডানপাশের সার্চবক্সে সার্চ দিলাম, ‘আজকের তারিখ’ লিখে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সার্চ রেজাল্ট পেয়ে গেলাম, ২৩ অক্টোবর ২০২১। সার্চ ইঞ্জিনের নামটাও বেশ মজার। টমটম, হ্যা, সেটাই ছিলো সার্চইঞ্জিনটার নাম। আগের জমানায় ঘোড়ার একধরনের গাড়ির নাম ছিলো টমটম। সেখান থেকেই হয়তো নামখানা এসেছে। কিন্তু, গুগলের কি হলো? কোন কিছু সার্চ দিলে তো গুগলই উত্তর দিতো আগে, এখন তাহলে হলো কি? জবাবটা পেতে বেশ কয়েকটা পেজ ঘুরে বেড়াতে হলো আমাকে। সেগুলো ঘুরে যা বুঝলাম, ২০১৫ সালে টমটমের আগমনের সাথে সাথেই শক্ত প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে সার্চইঞ্জিন গুগল। দিন যতো যায়, গুগলের অবস্থা আরো নাজুক হতে থাকে যখন বাংলাদেশি ডেভেলপারদের তৈরি টমটমের সাথে কাজ করার জন্য সারা বিশ্বের ডেভেলপাররা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এভাবে একের পর এক অবস্থান হারিয়ে দেওলিয়া হবার পুর্বমুহুর্তে ২০১৭ সালের মার্চে বন্ধ ঘোষণা করা হয় গুগল সার্চইঞ্জিন।

যে বস্তুটা আমি ব্যবহার করছি সেটা নিয়ে কিছুটা জানার আগ্রহ তৈরি হওয়ায় আবার সার্চ দিলাম টমটমে। কিন্তু, জিনিসটার নামই তো জানিনা। যাইহোক, ‘তরমুজ টেলিকম সামগ্রী’ লিখে সার্চ দিলাম। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই জবাব চলে আসলো। শত শত প্রোডাক্টের ভীড়ে কোথায় খুজবো আমি? এভাবে ৩২ নম্বর রেজাল্টের পাতায় দেখতে পেলাম বস্তুটির মতো একটা প্রোডাক্ট। নাম দেখলাম ‘টিট্যাব ৬৪এক্স’। সেটার বিবরনীতে গিয়ে দেখলাম, সপ্তম জেনারেশন ‘তরমুজ ওএস’ পরিচালিত এই টিট্যাব আসে ২৫৬ গিগাহার্টজের ৬৪বিট নবম জেনারেশন ইন্টেল কোর আই৬৪ প্রসেসরের সাথে ২৫৬ জিবি র‍্যাম আর ১২৮টেরাবাইট হার্ডডিস্ক। এগুলো পড়ে তো মাথা খারাপ হয়ে গেলো আমার। বলে কি এসব! ২০১৩ সালে আমরা কোথায় ২ জিবি র‍্যাম, ৩২০ জিবি হার্ডডিস্ক ব্যবহার করতাম ডেস্কটপে, সেখানে এই খেলনাতে আছে এমন কনফিগারেশন? মাথাই নষ্ট!

টিট্যাবের পর্দার নিচে দেখলাম ঘড়ি, সেখানে সকাল ৮টা বাজে। তখন মনে পড়লো, আমি তো হাইপারজাম্প দিয়ে ২০১৩ থেকে ২০২১ সালে চলে এসেছি, এখানে আমি কি করি সে সম্পর্কে কিছু না জানলে কিভাবে হবে? পথে বের হলে পুলিশ বাবাজীরা যদি ধরে! কি বলবো তাহলে? তাই আমার নিজের সম্পর্কেও একটু সার্চ দেওয়া দরকার বলে মনে হচ্ছে, তবে কতটুকু জানতে পারবো সেটা জানিনা। যাই হোক, আমার নাম লিখে সার্চ দিলাম। উত্তরে যা পেলাম, আমি ঢাকার একটা নামকরা বহুজাতিক কোম্পানির ওয়েব ডিজাইনার, ওয়েবসাইট তৈরি করে দেওয়াই আমার কাজ। তাহলে তো ল্যাঠা চুকে গেল। ২০১৩ সালে তো এই কাজই করতাম আমি। অফিসের ঠিকানা, সময়, এবং আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো জেনে নিয়ে বেরিয়ে এলাম টিট্যাবের ভূবন থেকে। অফিস ১০টা থেকে, তাই তাড়াতাড়ি গোসল, খাওয়া দাওয়া করে অফিসের পথে পা বাড়াতে হবে। পথে জ্যাম থাকবে কিনা সেটা আল্লাহ্‌-ই জানে।

 গোসল করতে গিয়ে তো বাধলো আরেক বিড়ম্বনা। কোন বালতি নেই, শাওয়ার নেই, কল নেই, তাহলে আমি গোসল করবো কিভাবে? অনেক খোঁজাখুঁজির পরে সেই বাথরুমের দেওয়ালে একটা লুকানো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্যানেল এর সন্ধান পেলাম। সেখান থেকেই টিপাটিপি করতে করতে এক সময় দেখলাম দেওয়াল ফুঁড়ে বের হলো শাওয়ার। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্যানেলে ঘোরাঘুরি করার সময় দেখতে পেলাম শুধু শাওয়ার না, বাথটাব থেকে শুরু করে সুইমিং পুল পর্যন্ত সবকিছুই হাজির করতে পারে এই ডিজিটাল প্যানেল। আসলেই অতুলনীয়! এখন আর তাহলে মানুষকে তার চাহিদার সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হবে না, যখন যেটা ব্যবহার করতে মন চাইবে তখনি সেটা হাজির হবে।

গোসল করে বের হবার পরে বুঝতে পারলাম যে কিছু খাওয়া দাওয়া করা দরকার। কিন্তু কোথায় পাবো? খুঁজে যে বেড়াবো তারও তো সময় নেই, অফিসে যেতে হবে। তাই টিট্যাবটা আবার হাতে তুলে নিয়ে খাবার-দাবার লিখে সার্চ দিলাম। সেখান থেকে পছন্দমতো কিছু খাবার অর্ডার করলাম। ওরা জানতে চাইলো কতক্ষনের মধ্যে ডেলিভারী দিতে হবে? আমি বললাম, ১০ মিনিটের মধ্যে। আসলে দেখতে চাইলাম ওরা কতোটা দ্রুত অর্ডার সাপ্লাই দিতে পারে, নাকি ২০১৩-র ডাক বিভাগের মতো ৭৪ বছর পরে ডেলিভারী দেয়।

৬ মিনিটের মাথায় দেখি দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ। ভাবলাম, ৬ মিনিট একটু বেশিই তাড়াতাড়ি হয়ে গেলো না? দরজা খুলে দেখি খাবার না, ডিজিটাল মতিকন্ঠের লোক। আজকের ডিজিটাল পেপারটা দিয়ে গেলো, আর জানিয়ে গেলো, আমার বিল বাকী আছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে না দিলে পত্রিকা দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। যাইহোক, পত্রিকাটা হাতে নিয়ে কয়েক কদম এগুনোর আগেই দেখি আবারো কলিং বেলের আওয়াজ। এবার দরজা খুলে দেখি একটা অল্পবয়সী ছেলে খাবার নিয়ে এসেছে। আমাকে দেখেই ছেলেটা বলা শুরু করলো,

“স্যার, আপনার বাসা চিনতে একটু দেরি হয়ে গেছিলো তাই ৩০ সেকেন্ড লেট হয়েছে ডেলিভারী দিতে। প্লিজ, আমার বসকে কথাটা বলেন না। তাহলে আমাকে ১৫০টাকা জরিমানা করবে। স্যার, সত্যি আমি ইচ্ছা করে দেরি করিনি।”

আমি ছেলেটাকে অনেক কষ্টে আশ্বস্ত করে ফেরালাম যে আমি তার বসকে কিছুই বলবোনা। খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে সোজা চলে এলাম আমার রুমে। খাবার সময়ও ছেলেটার কথা মনে পড়ছিলো। খুব অবাক হয়ে ভাবছিলাম, মাত্র আট বছরে মানুষ কতোখানি বদলে গেছে! আগে এই দেশেই একটা ফাইল এক টেবিল থেকে বিনা ঘুষে আরেক টেবিলে যেতে বছরের পর বছর লাগতো, একটা রেজিস্ট্রি চিঠি প্রাপকের কাছে পৌছাতে বছর ঘুরে আসতো, সেখানে মাত্র ১০ মিনিটে খাবার সাপ্লাই দিচ্ছে, তাও ৩০ সেকেন্ডের দেরি নিয়েও কতো টেনশন। এদিকে মতিকন্ঠে একটা খবরের সাথে সংযুক্ত ভিডিও দেখছিলাম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলের দাবির মুখে ভারতের সাথে মংলা বন্দর ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এলেন। দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধীদলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার নজির তো খুবই বিরল ছিলো ২০১৩ তে। মাত্র আটবছরে কতোটা বদলে গেছি আমরা? আসলেই আমরা বদলে গেছি, আমাদের দেশ বদলে গেছে, ডিজিটাল হয়ে গেছে বাংলাদেশ।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে রেডি হলাম অফিসে যাবার জন্য। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দেখলাম ৯টা ১৫ বাজে। একটু ভয়ে ভয়েই বের হলাম। যদি পথে জ্যাম থাকে, যদি ১০টার মধ্যে অফিসে পৌছাতে না পারি? যাই হোক, পথে খুব বেশি গাড়ি দেখলাম না। মাথার উপর দিয়ে আকাশপথে দেখলাম অনুভূমিক লিফট চলছে। একটু কৌতুহল হলো সেটা নিয়ে, তাই একটা লিফট টার্মিনালে ঢুকলাম। দেখলাম আমার মতো আরো কয়েকশ লোক দাড়িয়ে আছে তাদের গন্তব্যস্থলগামী লিফটের জন্য। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমার লিফট চলে এলো। তাই উঠে পড়লাম। ভেতরে ঢুকে আমার গন্তব্য সম্পর্কে লিফট পরিচালনাকারীকে জানালাম। এর পরে ভেতরের একটা ফাঁকা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লাম। প্রায় ১৫ মিনিট পরে পরিচালনাকারী আমার নাম ধরে ডাক দিলেন। তারপরে বললেন, রেডি হন, এক মিনিটের মধ্যে আপনার গন্তব্যে পৌছে যাবেন। আমি উঠে গিয়ে লিফটের দরজার সামনে দাড়ালাম এবং লিফট থামার পরে নেমে গেলাম। টিট্যাবটা বের করে দেখি ৯টা ৫০ বাজে। হাতে যেহেতু সময় আছে, তাই একটু ধীরে সুস্থেই অফিসের পথে হাটা ধরলাম।

হাটছি … আর হাটছি। এমন সময় একটা বিকট শব্দে হুড়মুড় করে উঠে দেখি আমি বিছানায়। বুঝতে পারছিনা কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা। পকেট হাতড়ে টিট্যাবটা খুজলাম কিন্তু পেলাম না। কিন্তু মাথার কাছে বালিশের নিচে মোবাইলটা ঠিকই আছে। সেখানে সময় দেখলাম ২৯ মে, ২০১৩। এতোক্ষন কি আমি তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম? স্বপ্নই যদি দেখছিলাম তাহলে স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলো কেন? ভালোই তো ছিলাম ২০২১ সালের বাংলাদেশে। কেন শুধু শুধু ডিজিটাল ২০১৩ সালে ফিরে এলাম?

এমন সময় মনে পড়লো আমার না বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা চাকরীর দরখাস্ত করতে হবে, অনলাইনে। কিন্তু কিভাবে করবো? বেঙ্গল অ্যানোনিমাসের জ্বালায়তো বিপিএসসি, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে সব বড় বড় ওয়েবসাইট-ই অচল হয়ে গেছে। এই দুর্দিনে কিভাবে আমি আবেদন করবো বাংলাদেশ ব্যাংকে? এদিকে সময়ও তো পেরিয়ে যাচ্ছে। ওহ আল্লাহ্‌…… আমি তো ২০২১ সালেই ভালো ছিলাম। কেন শুধু শুধু আমাকে এই ডিজিটাল বাংলাদেশে নিয়ে এলে? কেন?

এক চিলতে রোদ্দুর । একটি অসমাপ্ত প্রেমের গল্প

এক চিলতে রোদ্দুর । একটি অসমাপ্ত প্রেমের গল্প

জনাকীর্ন বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনির এককোণে অল্প একটুখানি জায়গা খালি পড়ে আছে দেখে ছেলেটা এগিয়ে গেল সেদিকে। কিন্তু সেখানে যাবার আগেই দেখলো কোথা থেকে এক কোট-টাই পরা বাবুসাহেব সেই জায়গাটার দখল নিয়ে নিয়েছে। মনেমনে একটু হাসলো ছেলেটা, তারপর বসে একটু জিরিয়ে নেবার স্বপ্নখানা জলাঞ্জলি দিয়ে বের হয়ে গেল যাত্রী ছাউনি থেকে।

abstract_0001

এভাবে তীরে এসে তরী ডোবার ঘটনা যে আজই প্রথম তা কিন্তু না। এটা বলতে গেলে একটা নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে ছেলেটার জন্য। গত ৬ মাসে তো কম ইন্টারভিউ দিলোনা, কিন্তু লাভের খাতা আজো শূন্য। সবাই শুধু বলে আপনি তো বেশ মেধাবী ছাত্র, দেশসেরা একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্টক্লাস পেয়েছেন, তাহলে আমাদের মতো অখ্যাত একটা প্রতিষ্ঠানে কেন চাকরির আবেদন করেছেন? ছেলেটা কিছুতেই বোঝাতে পারেনা একখানা চাকরী তার কতোটা প্রয়োজন এই মুহুর্তে। ছেলেটা জীবনে এতোগুলো পরীক্ষায় ফার্স্টক্লাস পেয়ে এসেও বুঝতে পারেনা এতো ভালো ইন্টারভিউ দিয়েও একজন আবেদনকারীর কেন চাকরী হয়না। এদিকে প্রাইভেট পড়িয়ে যা কিছু সঞ্চয় করেছিলো সেগুলোও শেষের পথে। এভাবে আর কতদিন চলবে? কি করবে ছেলেটা সেগুলো ফুরিয়ে যাবার পরে? কিভাবে একমাত্র ছোটবোনের বিয়ে দেবে সে? কিভাবে অসুস্থ মাকে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে?

এসব কথা ভাবতে বসলে আজকাল ছেলেটার মাথায় কিছু কাজ করেনা। এদিকে আত্নীয়স্বজনও বলাবলি শুরু করেছে, একটা চাকরী জোগাড় করতে না পারলে সে আবার কিসের ভালো ছাত্র? এসব ভাবনার ভীড়ে যখন সে ডুবতে বসেছে তখন মাথা তুলে দেখে, তার বাস এসে গেছে এবং বাসের হেলপার বাসে উঠতে তাগাদা দিচ্ছে যাত্রীদের। তাই আর অযথা বসে সময় নষ্ট করলো না ছেলেটা। পরে যদি আবার তাকে না নিয়েই বাসটা ছেড়ে দেয়, কিভাবে পৌছবে  সে চট্টগ্রামে?

বাসের ভিতরে উঠে দেখলো বেশ পিছনের দিকে তার সিটটা, যদিও এসব নিয়ে আজকাল খুব একটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। এটা ভেবেই সে খুশি হয় যে বাসের চালক তাকে ভিতরে বসতে দিয়েছে। কিন্তু দিন যেভাবে বদলে যাচ্ছে তাতে কতদিন আর এভাবে বসতে দিবে সেটা নিয়েই সে যথেষ্ট শঙ্কায় আছে। যাইহোক, জানালার পাশের সিটটাতে বসে পাশের সিটে নিজের ক্ষীণকায় ব্যাগটা রাখলো। বাস ছাড়বো ছাড়বো করছে তবুও ছেলেটার পাশের সিটটা খালিই রয়ে গেল। ছেলেটা ভাবলো ভালোই তো হলো, একটু আরাম করে যাওয়া যাবে। পথ তো আর কম দূরের না।

হঠাত ধুপধাপ আওয়াজ সহকারে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এক তরুনীর আগমন ঘটলো বাসের ভেতরে। অল্পবয়সী ছেলেপুলে যারা ছিলো তারা একটু নড়েচড়ে বসলো মেয়েটিকে একটু ভালো করে দেখার জন্য। শুধু ছেলেপুলে কেন, বয়সে প্রবীন মুরুব্বীরাও তো বাদ গেল না, তারাও আড়চোখে দেখে নিলো মেয়েটিকে। ছেলেটার ভেতরে অবশ্য কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। বাস্তবতার নির্মম কষাঘাতে রোমান্টিসিজম নামক বস্তুটা সেই কবেই যে নির্বাসনে পালিয়েছে তার মন থেকে, তার কোন হিসাব নেই। তাই, এসব আর ছেলেটার মনে আজকাল কোন দাগ কাটেনা। আজকাল অবশ্য এসব সুন্দরী মেয়েদের দেখলে কিঞ্চিৎ বিরক্তই হয় সে।

পুরো বাসটা একনজর দেখে মেয়েটা দেখলো পুরো বাসে একটাই সিট খালি আছে। তাই সে ছেলেটার পাশে এসে জানতে চাইলো, “ভাইয়া ব্যাগটা কি আপনার?”

ছেলেটা মাথা না তুলেই বললো, “জ্বী, আমার। আপনি বসবেন?”

মেয়েটা বললো, “যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে তাহলে আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি?”

মনে মনে হাসলেও মুখে একটা গাম্ভীর্য বজায় রেখে ছেলেটা বললো, “আমার কোন সমস্যা নেই। আপনি বসতে পারেন। তবে পিছনের দিকের সিট তো, কতটুকু আরাম করে বসতে পারবেন সেটা বলতে পারবোনা।”

কথাটা বলে ব্যাগটা সিট থেকে তুলে বাংকারে রাখলো ছেলেটা। মেয়েটাও চুপচাপ বসে পড়লো। ছেলেটা সরাসরি মেয়েটার মুখ দেখেনি কিন্তু ধারণা করে নিলো মেয়েটা কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ হবে নিশ্চয়। কারন, বেশ দামী একটা সুবাস ভেসে আসছে মেয়েটার শরীর থেকে এবং কথাবার্তাতেও যথেষ্ট অভিজাত বলেই মনে হলো। যাইহোক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্বের কারনেই সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে এটা এড়িয়ে যেতে। কারন, এতো দীর্ঘক্ষন বাসে বসে থাকা বেশ বিরক্তিকর। যদিও কিছু ভারতীয় বন্ধুর কাছে সে শুনেছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিল্লী ট্রেনে করে যেতে প্রায় ২৪ ঘন্টা লাগে। বন্ধু বলতে অবশ্য ফেসবুকের পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তো তখন সাইবার সেন্টারে গিয়ে মাঝে মাঝে ফেসবুকে সেসব বন্ধুদের খোঁজ খবর নিতো, একটু আধটু চ্যাটিং ট্যাটিং করতো আর কি। কতোদিন ফেসবুকে বসা হয়না, কেমন আছে তার সেসব বন্ধুরা! হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা মনে পড়ে গেল ছেলেটার। একের পর এক স্মৃতিগুলো হুড়মুড়িয়ে মনের ক্যানভাসটাকে রাঙ্গিয়ে দিয়ে যেতে থাকলো। সেই রঙ্গিন ভুবনের বিচরনে কিঞ্চিৎ বাঁধা পড়লো পাশের মেয়েটার কারণে। মেয়েটা ডাকছে মনে হচ্ছে। হ্যা, তাইতো, সত্যিই তো মেয়েটা ডাকছে।

মেয়েটা বললো, “ভাইয়া, আপনার পাশের জানালাটা একটু খুলে দিন না, আমার খুব অস্বস্তি লাগছে।”

ছেলেটা উঠে জানালাটা খুলে দিলো। হঠাত তার খেয়ালে আসলো মেয়েটা বলছে তার অস্বস্তি লাগছে। পরে আবার বমি টমি করে দিবেনা তো? তাই আবার জিজ্ঞেস করলো, “আপনার বমি বমি লাগছে নাকি? সমস্যা হলে বলেন, আমি ওইপাশে বসছি।”

মেয়েটা এবার হেঁসে উঠলো। তার মুক্তার মতো চকচকে দাঁতগুলো ছেলেটাকে কিঞ্চিৎ এলোমেলো করে দিচ্ছিলো কিন্তু সম্বিত ফিরে পেলো মেয়েটার কথা শুনে, “আরে না না, সেরকম কোন সমস্যা নেই। তবে হ্যা, অবশ্যই আপনাকে জানাবো তেমন কিছু হলে।”

আবার চুপচাপ চারপাশ। ছেলেটাও কিছু বলছে না, মেয়েটাও না। কোন মেয়ের সুন্দর দাঁত দেখে যে একটা ছেলের মনে ভাবাবেগ সৃষ্টি হয় সেটা আমার জানা নেই, সম্ভবত সে ছেলেটারও জানা ছিলোনা। কিন্তু, রোমান্টিসিজম বিবর্জিত একটা ছেলের সাথেই আজ এরকম একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, এটা কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছেনা ছেলেটার। মেয়েটাই আবারো এই নিস্তব্ধতার অবসান ঘটালো। বললো, “আমি সামিয়া, ঢাকা সিটি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পাশ করেছি। চট্টগ্রাম যাচ্ছি চুয়েট এর ভর্তি পরীক্ষা দিতে। আর আপনি?”

মেয়েটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে ছেলেটার জন্য। উত্তরে ছেলেটা কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। সত্য বলবে নাকি মিথ্যা বলবে? সত্যি বললে নিশ্চয় মেয়েটা আর কথা বলতে চাইবেনা, তাই মিথ্যা বলাটাই ভালো হবে। কিন্তু ছেলেটার মন কিছুতেই মিথ্যা বলাতে সায় দিতে চাচ্ছে না।

মেয়েটা কোন উত্তর না পেয়ে বললো, “আচ্ছা ঠিক আছে, বলতে না চাইলে দরকার নেই। আমি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নটা করিনি।”

এর পরে আর কাল বিলম্ব করলোনা ছেলেটা। সিদ্ধান্ত নিলো যা হয় হবে, তবু সত্যি কথাটাই বলবে। বললো, “আমি সজল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করেছি। আপাতত বেকার, একটা চাকরী খুজছি। বলার মতো আপাতত এটুকুই আছে। আর কিছু জমা নেই।”

সামিয়ার মুখে হাসির স্পষ্ট ছাপ দেখতে পেল ছেলেটা। সে বললো, “আপনি তো বেশ সুন্দর করে কথা বলেন, সজল সাহেব। লেখালেখি করেন নাকি?”

সামিয়ার কথায় ছেলেটা এবার কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল। বললো, “আরে ধুর! কি যে বলেন না! কোথায় লেখালেখি আর কোথায় আমি? তো ইঞ্জিনিয়ার হতে যাচ্ছেন, ভেরি গুড। কিসের ইঞ্জিনিয়ার হবেন কিছু ভেবে টেবে রেখেছেন?”

এবার লজ্জায় সামিয়ার মুখখানা রাঙ্গিয়ে গেলো। সে সময় তাকে কী যে অদ্ভুত সুন্দরী লাগছিলো, সে যারা দেখেনি তাদের কিছুতেই বোঝানো যাবেনা। সেই সদ্য সূর্য ডোবা পশ্চিমাকাশের মতো মুখে সামিয়া বললো, “কি মনে হয়! এই হাত দুটো দেখেছেন? এরকম মেহেদী দেওয়া হাতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন মানায়? বলেন! আমার কলেজের বান্ধবীদের দেখেছি, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে বলে কী না করেছে! পাগলের মতো পড়াশোনা করেছে, পূর্ব-পশ্চিম ভুলে। বয়ফ্রেন্ডদের পর্যন্ত সময় দিতোনা শুধুই ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য। আর আপনি কিনা আমাকে বলছেন কিসের ইঞ্জিনিয়ার হবো? মজা করছেন নাকি আমার সাথে? দেখুন, আমার সাথে মজা করলে কিন্তু আমি কেঁদে দিবো বলে রাখলাম।”

এবার সজল সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেল। কারণ, এই বাসের মধ্যে যদি মেয়েটা কান্নাকাটি শুরু করে তাহলে আর রক্ষা থাকবেনা। পাবলিকের পিটুনিতে সোজা উপরওয়ালার কাছে পৌছে যেতে হবে। তাই, মাফ চাই বাবা। অনেক হয়েছে। আর না!

এদিকে সজলকে চুপকরে যেতে দেখে মেয়েটা ভিতরে ভিতরে উসখুস করতে লাগলো। অবশেষে বলেই ফেললো, “কি ব্যাপার? হঠাৎ মুড অফ হয়ে গেলো কেন? ভালো লাগছেনা কথা বলতে? অবশ্য ভালো না লাগারই কথা। আমার বান্ধবীরাও বলে, আমি নাকি খুব বেশি কথা বলি। আচ্ছা থাক, আর কোন কথা বলতে হবেনা।”

এই কথা বলে সামিয়া মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে ফিরে রইলো। এদিকে মেয়েটির ছেলেমানুষি দেখে সজল মুখটিপে হাসছে। এই বয়সের মেয়েরা কেমন হয় সেটা যেহেতু ওর অজানা না, তাই ব্যাপারটা খুব বেশি গায়ে মাখলো না সজল। চুপচাপ মেয়েটার কান্ড কারখানা দেখছে। মেয়েটা একবার এদিক আর একবার ওদিক করছে। কিছুক্ষন পরে তো রীতিমতো রেগে গিয়ে সজলকে একটা কড়া ধমক লাগিয়ে দিলো। “এই যে মিস্টার, খুব ভাব ধরা শিখে গেছেন দেখছি! কথাই বলছেন না যে!”

এবার সজল আর না হেঁসে পারলোনা। হাসিটা মনে হয় একটু জোরেই হয়ে গিয়েছিলো। ওপাশের সিটে বসা আংকেল উৎসুক ভাবে তাদের দিকে তাকালো। তাই একটু সতর্ক হয়ে সজল বললো, “তো কি করবো বলেন, আপনিই তো বললেন একটু আগে যে আর কথা বলা লাগবেনা। এখানে আমার কি দোষ? আচ্ছা ভালো কথা, আপনি একা একা চট্টগ্রাম যাচ্ছেন, ভয় লাগছেনা? কেউ যদি আপনাকে ধরে টরে নিয়ে যায়? কিংবা, আপনার বাসা থেকেও আপনাকে এতো দূরের পথে একলা কিভাবে বের হতে দিলো?”

সজলের কথা শুনে তো সামিয়া তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। “আরে আজব তো! এখন সব দোষ আমার! যান, আমার সাথে কথা বলা লাগবেনা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকুন। খবরদার আমার দিকে তাকাবেন না।”

আবারো হাসি পেল সজলের। সামিয়ার ছেলেমানুষি দেখে বেশ মজা পাচ্ছে সজল। কিছুক্ষনের জন্য একদম বেমালুম ভুলে গেছে তার সকল দুশ্চিন্তার কথা। কিন্তু এভাবে মেয়েটাকে রাগ করতে দেখে তারও আর ভালো লাগছেনা। তাই বললো, “সামিয়া, প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি আসলে আপনার কথা ভেবেই চুপ করে আছি। আপনার সাথে বেশি কথাবার্তা বললে পাশের লোকগুলো আপনাকে খারাপ মেয়ে মনে করতে পারে, যেটা আমি চাই না। আচ্ছা আপনার পরীক্ষা কবে?”

কথা গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো সামিয়া, কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। তাই সজল আবারো বললো, “আরে বাবা, স্যরি বললাম তো!”

এবার সামিয়া বলতে শুরু করলো, “দেখুন মিস্টার, আমাকে কচি খুকি ভাবতে যাবেন না, ঠিক আছে! চিটাগাং আমার নানুর বাড়ি। সেই ৫ বছর বয়স থেকে এই পথে আমার যাতায়াত। আমাকে ধরে নিয়ে যাবে সেরকম বুকের পাটা নিয়ে এই রাস্তায় কেউ চলাফেরা করে না। বুঝলেন! আর আশেপাশের মানুষগুলোর কথা বলছেন না? আই ডোন্ট কেয়ার। তাদের কাজ হলো অন্যেরা কি করছে সেটা নিয়ে গালগল্প করা। আমি যদি ২ দিন না খেয়ে থাকি, দেখবেন আমার আশেপাশের একটা লোকও আমার জন্য একমুঠো খাবার নিয়ে এসে বলবেনা যে তুমি তো না খেয়ে আছো, নাও খাও। সো, তাদের কথা আমার কাছে বলতে আসবেন না। আমি বাসের ভেতর একা একা বোর হচ্ছি এবং আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে তাই একটু কথা বলতে চাইছি। এখন আপনার যদি আমার সাথে কথা বলতে ভালো না লাগে তাহলে সোজাসুজি সেটা বলে দিলেই তো পারেন। এভাবে নাটক করার তো কোন মানে নেই। তাই না?”

এতটুকু একটা মেয়ের মুখে এরকম শক্ত শক্ত কথা শুনে একরকম দিশেহারা হয়ে গেল সজল। এরকম সহজ সরল গোবেচারা টাইপের একটা মেয়ের মুখ দিয়েও যে এরকম কথা বের হতে পারে সেটা তার ধারণায়ও ছিলোনা। তবে যেটা বুঝতে পারলো সেটা হলো, মেয়েটা সোজা সাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করে। তাই সোজাসুজিই বলে ফেললো, “আমারও আপনার সাথে কথা বলতে মন্দ লাগছিলো না। কিন্তু আশপাশের লোকগুলোর কথা ভেবেই চুপ ছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, আপনার সাথে কথা বলতে গিয়ে একটা কথাই মনে হচ্ছিলো এইটুকু একটা মেয়ের সাথে কি কথা বলবো! কিন্তু একটু আগে আপনি যেরকম একটা ইওর্কার ডেলিভারি দিলেন, তাতে আমি কেন, লিটল মাস্টার শচীন আসলেও তার ব্যাট বলের লাইনে আনতে পারতো কিনা সন্দেহ আছে। যাইহোক, আমার কথায় কিছু মনে করবেন না, এবং কোন কারনে আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকলে আমি তার জন্য দুঃখিত।”

এবার সামিয়া বললো, “অনেক হয়েছে, এসব দুঃখিত টুকখিত রাখেন। আমি আপনার কতো বছরের ছোট হবো আল্লাহ-ই জানে। আমাকে ‘আপনি’ করে বলতে আপনার লজ্জা লাগছে না? বড় অদ্ভুত লোক তো আপনি! আর একবার যদি আমাকে আপনি করে বলেছেন তো আপনার খবর আছে!”

কথা শেষ না করে সামিয়া আবার বলতে শুরু করলো, “আচ্ছা আমরা মনে হয় ফুড ভিলেজে এসে গেছি, তাই না? চলুন একটু বাইরে যাই। কিছু কেনাকাটা করতে হবে।”

কেনাকাটা করতে হবে শুনে তো সজল চমকে উঠলো। চমকে তো উঠবেই, কারণ তার মানিব্যাগের যে অবস্থা! তাতে কেনাকাটা করতে গেলে বেইজ্জতই হতে হবে। সামিয়া হয়তো সজলের এই চমকে উঠা দেখলো না, কিংবা দেখতে চাইলোনা। সোজা গড গড করে হেটে নেমে গিয়ে হাঁক ছাড়লো, “কি ব্যাপার, নামবেন না নাকি!”

কোন উপায় না দেখে নিচে নামলো সজল। তারপর সামিয়ার পিছু পিছু ঢুকলো ফুড ভিলেজে। সজল অবশ্য এই ধরনের ফুডকোর্ট গুলো দেখলে বরাবর-ই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কারন আর কিছুই না, এখানকার খাবারের আকাশচুম্বী দাম। এর থেকে পথের ধারের দোকান গুলোতে দাঁড়িয়ে খাওয়া দাওয়াকেই অধিক সাচ্ছন্দের বলে মনে করে সে। সামিয়ার সাথে ফুড ভিলেজে ঢুকে একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো সজলের। যেখানেই যাচ্ছে দেখছে সামিয়াকে সবাই সালাম দিয়ে জানতে চাইছে আপামনি কি লাগবে। যেখানে অন্যেরা সহজে পাত্তাই পাচ্ছে না। যাইহোক, বেশ ঘুরাঘুরির পরে কেনাকাটাও কম করলোনা সামিয়া। ফুড ভিলেজের ভেতরে সজল যতোক্ষন ছিলো ততক্ষন দেখলো এক অন্য সামিয়াকে। খুব গম্ভীর, বিনা প্রয়োজনে কারোর সাথে কথা বলছেনা, বা বললেও জাস্ট হাই, হ্যালো টাইপের। কেনাকাটা শেষ করে ওরা আবার হাটা দিলো বাসের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে সামিয়া আবার দুষ্টুমি শুরু করলো। বলে উঠলো, “এর পরে যেদিন দেখা হবে সেদিন কিন্তু আপনি বিল পে করবেন। ঠিক আছে?”

সজলও কম যায় না, “আরে আমি তো আজই বিল পে করতাম। আপনিই তো চিটিং করে বিলটা দিয়ে ফেলেছেন। এর পরে আর এরকম করার সুযোগ আপনি কখনোই পাবেনা।”

বাসে উঠে সজল সামিয়াকে জিজ্ঞেস করলো, “এই দোকানদার গুলো সবাই আপনাকে চিনে, তাই না?”

সজলের কথা শুনে রেগে গেলো সামিয়া। “আপনি দেখি ভারি বেহায়া! আবার আমাকে আপনি করে বলা শুরু করে দিয়েছেন!”

সজল ভুল বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বললো, “সরি, ভুল হয়ে গেছে। আর হবেনা।”

সামিয়া বললো, “হ্যা, এদের অধিকাংশ-ই আমাকে চেনে। এতো ঘন ঘন আসা হয় যে, শুধু এরা না, আরো অনেকের সাথেই চেনাজানা হয়ে গেছে। যাইহোক, আপনার সাথে আরো অনেক কথা বলবো কিন্তু তার আগে একটু খাওয়া দাওয়া করে নিতে হবে। আসুন, স্টার্ট করে দিন।”

সজলের অবশ্য বেশ অস্বস্তি লাগছিলো সামিয়ার সাথে খেতে। এর কারণ শুধু যে সামিয়া একটা অচেনা মেয়ে তা না, প্রতি মুহুর্তে সামিয়ার কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছে সে। এতটুকু একটা মেয়ে সবকিছুতেই তার থেকে অধিক ম্যাচিউরিটির পরিচয় দিয়ে চলেছে। এক পর্যায়ে সামিয়ার পীড়াপীড়িতে যোগ দিলো সজল। খাওয়া-দাওয়া করে কিছুক্ষন বিশ্রামের বিরতি। আইডিয়াটা যদিও সামিয়ার-ই ছিলো কিন্তু সেখানে বিশ্রাম কতটুকু হয়েছিলো সেটা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ আছে। সজলকে একটু চোখ বুজতে দেখলেই ঘুম ভাঙ্গিয়ে সামিয়া জিজ্ঞেস করেছে বিশ্রাম কেমন হচ্ছে। এক পর্যায়ে বিশ্রামও পন্ড হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে সামিয়ার নন-স্টপ বকবক। কোন একবিন্দুতে বাঁধা না থেকে সে ঘুরে বেড়িয়েছে এ ডাল থেকে ও ডালে।

আর সজল! নীরব শ্রোতার মতো, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে চলেছে সামিয়ার সেসব কথা। এভাবে পথও একসময় ফুরিয়ে এলো। কিন্তু সামিয়ার কথা আর শেষ হয়না। বাস চট্টগ্রামে থামার পরেও প্রায় আধাঘন্টা দাঁড়িয়ে কথা বললো সামিয়া। তারপরে যাবার আগে একটুকরো কাগজে তার বাসার ঠিকানা লিখে দিয়ে গেলো। তারপরে বিদায় নিয়ে কয়েক কদম এগিয়েও আবার ফিরে এলো। খুব জরুরী একটা কথা নাকি বলা বাকি রয়ে গেছে। তারপরে সজলের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

“আপনি অনেক ভালো একটা ছেলে সজল ভাইয়া। আমি আল্লাহর কাছে দোওয়া করি তিনি যেন আপনাকে অনেক বড় করেন। গত কয়েক ঘন্টায় আমি আপনাকে যতো জ্বালাতন করেছি, আপনার জায়গায় অন্যকেউ হলে নিশ্চিত আমাকে কষে একটা থাপ্পড় লাগাতো। আমিও সচরাচর অবশ্য এরকম করিনা। কিন্তু আপনাকে দেখে কেন যে এরকম করলাম, ঠিক বুঝলাম না। যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তো মাফ করে দিবেন। তবে আমি যেতে যেতে আবার ফিরে আসলাম কেন জানেন? আপনাকে ধন্যবাদ দেবার জন্য। সত্যি আপনি অন্যরকম। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো আমার ফোন নম্বর চাইতো, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা জানতে চাইতো। আপনাকে ধন্যবাদ অন্যদের থেকে আলাদা হবার জন্য। আমার বাসার ঠিকানা তো আগেই দিয়েছি। সময় করে অবশ্যই আসবেন আমাদের বাসায়। আম্মু আপনাকে দেখলে অনেক খুশি হবে। ভালো থাকবেন, এবং আমার জন্য দোওয়া করবেন। যেন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বাবার ইচ্ছাটা পূরন করতে পারি।”

এবার সামিয়া সত্যি সত্যিই চলে গেল। সামিয়ার শুন্যতা সত্যিই আমাকে কিছুক্ষনের জন্য আবেগশুন্য করে দিলো। চেয়ে দেখলাম সামিয়ার চলে যাওয়া। অনেক ইচ্ছা করছিলো সামিয়াকে ফিরিয়ে আনি। আরো কিছুক্ষন আমার সাথে থাকতে বলি। কিন্তু কিভাবে বলবো? কোন যোগ্যতায় বলবো? একদিন ফুড ভিলেজের বিল দেবার মতো টাকা যার পকেটে নেই, সেই আমি কিভাবে সামিয়াকে পিছু ডাকবো? তার চেয়ে বরং দূরে থাকি, সেই ভালো। সামিয়া না হয় এক চিলতে রোদ্দুর হয়েই থাক আমার শ্রাবণের আকাশে। শত অভাবের বর্ষনের মাঝে এক টুকরো রোদ হয়ে বিলিয়ে যাক একটুখানি খুশির আভা।

নিজেই নিজেকে নষ্ট করেছি: তসলিমা নাসরিন

নিজেই নিজেকে নষ্ট করেছি: তসলিমা নাসরিন

খাসখবর ডেস্ক: কেমন আছেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন? প্রায় দেড় যুগের মতো তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে। বিদেশে বসেও থামেনি তার লেখালেখি। পেয়েছেন কলকাতার আনন্দ পুরস্কারসহ বিশ্বের অনেক পুরস্কার। আগের মতো লিখতে পারছেন না বা লিখছেন না। ‘উতল হাওয়া’, ‘আমার মেয়ে বেলা’, ‘ভ্রমর কইও যাইয়া’, বা ‘ক’ -এর মতো বই আর আসছে না। আগের মতো কাব্যও নেই, কবিতাও না। একাধিক স্বামী ও একাধিক পুরুষের সাথে তার দেহজ সম্পর্কের কথা তো তিনি বেশ রসিয়ে লিখেছেন। কিন্তু আজকাল বয়সের কারণে নারী হিসেবে আর এই সম্পর্ক অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

pic28এখন তিনি হতাশ, চোখের নিচে কালি পড়েছে, চামড়ায় বয়সের চাপ, শরীরের মধ্যে নানারকম ব্যথাতো আছেই। একাকিত্ব তাকে আরও পঙ্গু করে দিচ্ছে। এমনি অবস্থায় বিদেশের কোথাও থিতু হতেও পারছেন না। দেশে ফেরাও তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে গেছে। যেই মৌলবাদীদের ভয়ে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন, সেই ভয় এখনও তাকে তাড়িয়ে মারছে।

প্রশ্ন: আপনার কাছে একটা প্রশ্ন। এই যে লেখালেখি করলেন, এর মূল উদ্দেশ্য কি ছিল, দেহের স্বাধীনতা না চিন্তার স্বাধীনতা?

তসলিমা: প্রশ্নটা আপেক্ষিক। আসলে আমিতো পেশায় ছিলাম চিকিৎসক। আমার বাবা চেয়েছিলেন তার মতো হতে। আমিও অধ্যাপক ডা. রজব আলীর মতো একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক হই। শৈশবে, কৈশোর এবং যৌবনে আমি অনুভব করি, নারীরা আমাদের সমাজে ক্রীতদাসীর মতো। পুরুষরা তাদের ভোগ্যপণ্যের মতো ব্যবহার করে। এ কারণেই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথমে লেখালেখির কথা ভাবি।

প্রশ্ন: স্বাধীনতার দাবিতে কি আপনার এই লড়াই?

তাসলিমা: আমি প্রথমত নারীর জরায়ুর স্বাধীনতার দাবি তুলি। একজন পুরুষ যখন চাইবে, তখনই তার মনোস্কামনা পূর্ণ করতে ছুটে যেতে হবে। এটা তো হতে পারে না। অথচ তখন ছুটে না গেলে জীবনের সব পূণ্য নাকি শেষ হয়ে যাবে। চিন্তার স্বাধীনতা না থাকলে ভালো লেখক হওয়া যায় না। দেহের স্বাধীনতার বিষয়টা গৌণ। তবে একেবারে ফেলনা নয়। পুরুষই একচেটিয়া মজা লুটবে, নারী শুধু ভোগবাদীদের কাছে পুতুলের মতো হয়ে থাকবে, এটা মেনে নিতে পারিনি।

প্রশ্ন: আপনি পরিকল্পিতভাবে নিজেকে আলোচিত করে তোলেন। আজ বাংলা সাহিত্যে বা বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে আপনি তো চরমভাবে অবহেলিত।

তাসলিমা: আমি একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছি। সত্য কথা সাহিত্যে অনেকের জন্য কষ্টদায়ক হয়। আমি আমার বহু স্বামী ও ভোগ্য পুরুষদের নামধাম প্রকাশ করে দেয়ায় অনেক বন্ধু আমাকে এড়িয়ে চলেন। বাংলা সাহিত্যের অনেক দামি দামি পুরুষও চান না যে আমি দেশে ফিরি। এক সময় আমার বিপক্ষে ছিল কট্টর মৌলবাদীরা। এখন প্রগতিশীল অনেক সাহিত্যিকও বিপক্ষে। কারণ এদের নষ্ট মুখোশ আমি খুলে দিয়েছি।

প্রশ্ন: আপনি চিকিৎসক থাকলেই ভালো করতেন। মিডিয়াতে কেন এলেন? সাহিত্যেই বা কেন?

তাসলিমা: আমি নারীর অধিকার নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু এখন মনে হয় আমি মানবিকভাবে আশ্রয়হীন। আর এ কারণেই আমি অন্য স্রোতে সুখ খুঁজেছি। পরিবার হারালাম, স্বামী সন্তান হলো না, ঘর-সংসার হলো না। তখন দৈহিক সম্পর্কে নেশাগ্রস্ত না থেকে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না।

প্রশ্ন: এখন আপনি কী চান?

তাসলিমা: অনেক কিছু। আমার হারিয়ে যাওয়া জীবন, যৌবন, ভোগ-উপভোগ, স্বামী-সন্তান, পরিবার-পরিজন। কিন্তু দিতে পারবেন কি? আজ আমি নিজ দেশের কাউকে দেখলে কুণ্ঠিত ও লজ্জিত হই। খ্যাতি, অর্থ, পুরস্কার সবই আছে, তবুও মনে হয় আমি ভীষণ পরাজিত। দিনে হইচই করে কাটাই, রাত হলে একাকিত্ব পেয়ে বসে। আগের মতো পুরুষদের নিয়ে রাতকে উপভোগ করার মতো শরীর মন কোনোটাই নেই।

taslima-nasrin

প্রশ্ন: এখন কেমন পুরুষ বন্ধু আছে?

তাসলিমা: এক সময় অনেক ব্যক্তিত্ববানদের পেছনে আমি ঘুরেছি। ব্যক্তিত্বহীনরা আমার পেছনে পেছনে ঘুরেছে। আজকাল আর সুখের পায়রাদের দেখি না। মনে হয় নিজেই নিজেকে নষ্ট করেছি। পরিচিত হয়েছি নষ্ট নারী, নষ্টা চরিত্রের মেয়ে হিসেবে। লেখালেখি করে তাই এসব পুরুষদের উপর আমার রাগ, ঘৃণা ও অবহেলাকে প্রকাশ করেছি। যৌনতার রানী হিসেবে প্রকাশিত হলাম, অথচ এই রানীর কোনো রাজাও নেই প্রজাও নেই। এই জন্য আজ হতাশায় নিমজ্জিত আমি।

প্রশ্ন: ধর্ম-কর্ম করেন?

তাসলিমা: মাঝেমধ্যে মনে হয় সব ছেড়ে নামাজ-রোজা করি, তাওবা করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি। কম্যুনিস্টরাও তো এক সময় বদলে যায়। আমার জন্ম ১২ ই রবিউল আউয়াল, মহানবীর জন্মদিনে। নানী বলেছিলেন, আমার নাতনী হবে পরহেজগার। সেই আমি হলাম বহু পুরুষভোগ্য একজন ধর্মকর্মহীন নারী। বলা তো যায় না, মানুষ আর কত দিন বাঁচে। আমার মা ছিলেন পীরের মুরীদ। আমিও হয়ত একদিন বদলে যাবো।

প্রশ্ন: বিয়ে-টিয়ে করবার ইচ্ছে আছে কি?

তাসলিমা: এখন বিয়ে করে কি করবো? পুরুষটিই বা আমার মধ্যে কি পাবে? সবই পড়ন্ত বেলায়। যে বিয়ে করবে, সে যদি আমার মধ্যে যৌন সুখ না চায়, সন্তান না চায়, এমন মানব পেলে হয়ত একজনকে সঙ্গী করার কথা ভাবতেও পারি।

BANGLADESH_(F)_0109_-_Taslima_Nasrin

প্রশ্ন: আপনি কি একেবারে ফুরিয়ে গেছেন?

তাসলিমা: না, তা ঠিক নয়। তবে পুরুষতো শত বছরেও নারীকে সন্তান দেয়। মেয়েরা তো পারে না। আমার এখনও রজস্রাব বন্ধ হয়নি। মেশিনারি ঠিক আছে। তবে নতুন বা আনকোরাতো নয়, লক্কর ঝক্কর মেশিনারির মতো আরকি? পুরুষদেরও বয়স বাড়লে খাই খাই বেড়ে যায়। এতটা মেটানো তো আর এই বয়সে সম্ভব হবে না।

প্রশ্ন: বয়স বাড়লে পুরুষেদের সেক্স বাড়ে এটা কিভাবে বুঝলেন?

তাসলিমা: কত বুড়ো, মাঝ বয়েসী ও প্রবীণ বন্ধুদের নিয়ে দেহজ খেলায় মেতেছি, এটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

প্রশ্ন: রাত যখন বিশ্বকে গ্রাস করে, আপনার ঘুম আসছে না- তখন আপনার বেশি করে কি মনে পড়ে?

তাসলিমা: খুব বেশি মনে পড়ে আমার প্রথম প্রেম, প্রথম স্বামী, প্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। অনেক কাঁদি তার জন্য। পেয়েও হারালাম তাকে। রাগ হয়েছিল বিয়ের রাতেই। আমি তো ডাক্তার তার পুরুষদণ্ডে ক্ষত দেখি। বুঝতে পেরেছিলাম যাকে জীবন দিয়ে ভালবাসি, সে বেশ্যাবাড়ি যায়। সিপিলিস-গনোরিয়ায় আক্রান্ত সে। তবু তাকে বলি, আজ বাসর রাতে যৌনকেলি হবে না। তোমার শরীরে রোগ। এখন আমার শরীরে তুমি ঢুকলে আমিও এ রোগে আক্রান্ত হবো। তোমাকে সুস্থ করে তুলবো, তারপর হবে আমাদের আনন্দ বাসর। কিন্তু পুরুষতো জোর করতে চাইলো, ব্যর্থ হয়ে চলে গেলো পতিতার বুকেই।

প্রশ্ন: অন্য স্বামীদের কথা মনে পড়ে না?

তাসলিমা: তারা এমন উল্লেখযোগ্য কেউ নন। তাদের মুরোদ আমি দেখেছি। তার চেয়ে বহু বন্ধুর মধ্যে আমি দেখেছি, কেমন উন্মত্ত তেজ। ওদের স্মৃতি মনে পড়ে মাঝে মধ্যে।

প্রশ্ন: দেশে ফিরবেন না?

তাসলিমা: দেশই আমাকে ফিরতে দেবে না। আর কোথায় যাবো? বাবা-মা-ভাই-বোন সবাইকে আমি লেখাতে জবাই করে দিয়েছি। আসলে নেশাগ্রস্তই ছিলাম, অনেক কিছু বুঝিনি। আজ আত্মীয়-স্বজনও আমাকে ঘৃণা করে। মরার পর লাশ নিয়ে চিন্তা থাকে, আমার নেই। যে কোন পরীক্ষাগারে দেহটা ঝুলবে। ছাত্রদের কাজে লাগবে।

তথ্যসূত্রঃ খাসখবর