সন্ত্রাসদমন আইন নাকি ট্রানজিট-টিকফা-এফবিআইয়ের রক্ষাকবচ?


গোপনীয়তার কিছু নাই, আমি ধরেই নিয়েছি, আমরা যাই করি যাই ভাবি যাই স্বপ্ন দেখি সবই বিগব্রাদারের সর্বদর্শী প্যানঅপটিকনের দৃষ্টির তলে, এক হাজারচক্ষু দানবের নজরের অধীন। এটা এক ম্যাট্রিক্স ফিল্মের জগত, যেখানে আমাদের মগজে বসত করে অন্যজনা। কিন্তু না বলেও তো উপায় নাই।

cybercrime

ঠিক যেসময় ট্রানজিট চুক্তির বলে ভারতীয় ভেহিকেল সড়ক ও নৌপথ দিয়ে চলাচল শুরু করেছে, রামপালের মতো প্রকল্পগুলোতে ভারতীয়দের আনাগোনা ও স্থাপনা দৃশ্যমান হচ্ছে সেসময় সন্ত্রাস দমনে নতুন আইনটি যথেষ্ঠ লাগসই। যখন টিকফা সই হতে যাচ্ছে, এ অঞ্চলে এফবিআইসহ মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উতকট চেহারা নিতে যাচ্ছে, তখন দুই পরাশক্তির স্বার্থকে এনহ্যান্স করায়, সুরক্ষিত করায় এনহ্যান্সড দাঁতনখঅলা আইনের প্রয়োজন তো হবেই। ওস্তাদের মাইর নাকি শেষ রাতে!

আরো ভয়ংকর হচ্ছে, অনলাইন, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ, মেইলসহ ভার্চুয়াল পরিসরে আপনি বা আপনার নামে করা যেকোনো প্রতিবাদ, সামালোচনা, ক্ষোভকেই সন্ত্রাসী কার্যের সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে হাজির করা, বিনা বিচারে আটক করা এবং সম্পত্তি ক্রোক করার অগাধ ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে অনুরূপ আইনের বলেই স্টিং অপরাশেনের কৌশলে আপনাকে পটিয়ে উশকিয়ে আপনার মুখ থেকে কথা বের করে, বা আপনাকে জিম্মি করে নাফিস, বোস্টনের দুই ভাই বা লন্ডনের ছুরিবাজ ছেলেটির মতো ‌’সন্ত্রাসী’ হতে/সাজতে বাধ্য করতে পারবে। পারবে, আপনার বন্ধুকে আপনার পেছনে লাগিয়ে দিতে, আপনার মেইল-ফেসবুকসহ যাবতীয় অনলাইন অ্যাক্টিভিটিতে হানা দিতে। আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে। এবং পারবে, ভয় দেখিয়ে পুলিশ-র‌্যাব বা তাদের সোর্সদের নামে ব্যবসাও করতে!!! বিশ্বের সন্ত্রাস দমনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, প্রায় নব্বইভাগ ক্ষেত্রে নিরীহরাই এর স্বীকার। এর থেকে বেশি বলা গেল না।

সবচেয়ে বড় কথা, এত কিছু হবে অন্যের স্বার্থে। আইনের ভাষায় সেই বিজাতীয় স্বার্থের ল্যাঞ্জাটা লুকানোর দরকারও আইন প্রণেতারা বোধ করেন নাই। সংক্ষেপে বলি:

১. ভারত প্রজাতন্ত্রের সুরক্ষা: আইনে সন্ত্রাসী কার্য বলতে ‌’বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের’ ওপর আঘাতে কথা বলা হলেও প্রয়োগের ধারাগুলোতে দিব্যি ‘বাংলাদেশ’ রিপ্লেসড হয়েছে ‘অন্য কোনো প্রজাতন্ত্র’ কথাটার দ্বারা। আমেরিকা হলে কেবল রাষ্ট্র কথাটাতেই চলতো, কিন্তু এ অঞ্চলে ‘অন্য প্রজাতন্ত্র’ তো একটাই: মহামহিম ভারত। আইনের ৬ ধারার ‘সন্ত্রাসী কার্যের’ সংজ্ঞার শুরুতে একবার মাত্র ‘বাংলাদেশ’ শব্দটা থাকলেও বাকি উপধারায় সেই ‘অন্য প্রজাতন্ত্র কিংবা অন্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা, অন্য ব্যক্তি’দের সদম্ভ উপস্থিতি। বুঝতে বাকি নাই, সখি তুমি কার?

২. দেশি সম্পদ ও জীবনের থেকে বিদেশি সম্পদ ও জীবনের দাম বেশি: দেশের গাড়ি ভাংলে বা কোনো স্থাপনায় ঢিল মারলে যদি ২-৩ বছরের শাস্তি হয়, ‘অন্য কোনো ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের’ ক্ষতি করলে বা করার চিন্তা করলে বা আক্রমণাত্মক কথা/অভযেোগ করলে ন্যুনতম সাত বছর থেকে মৃত্যুদণ্ডপর্যন্ত শাস্তি! সঙ্গে সম্পত্তি ক্রোকের বোনাস। ব্রিটিশ আমলেও এই বিধান ছিল না।

৩. সার্বভৌম কপি পেস্ট শিল্প: আজকের প্রথম আলোয় মিজানুর রহমান খান বিস্তারিত লিখেছেন যে বিপদটা কোথায়। বাড়তি কথা এই, আইনের ভাষাটা ভারতের সন্ত্রাস দমন আইন UAPA থেকে মোটামুটি কপি পেস্ট করা। সেটা করতে গিয়েই সম্ভবত ‘প্রজাতন্ত্র’ সহ সেই প্রজাতন্ত্রের আইনের মেলা ধারা-উপধারা বাংলা অনুবাদে ঢুকে পড়েছে। আইন স্বার্থের রক্ষক, আইনই প্রমাণ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন কার স্বার্থের রক্ষক!!! জয় বাংলা!

৪. কার যুদ্ধ কে লড়ে? চ উপধারায় লেজ নাচিয়েই বলা হয়, ‘কোন সশস্ত্র সংঘাতময় দ্বন্দ্বের বৈরি পরিস্থিতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন নাই এইরূপ কোন বেসামরিক, কিংবা অন্য কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটাইবার বা মারাত্মক কোন শারীরিক জখম ঘটাইবার অভিপ্রায়ে কোন কার্য করে’ কোনো জনগোষ্ঠীকে ভীতি প্রদর্শন বা কোন সরকার বা রাষ্ট্রকে…বিরত থাকিতে বাধ্য করে’ ??? প্রশ্ন হচ্ছে, এইটা তো যুদ্ধমান কোনো রাষ্ট্রের বেলায় প্রযোজ্য, সেই রাষ্ট্র এখন কারা? যুক্তরাষ্ট্র-ভারত নয় কি?

৫. টর্চারের আউটসোর্সিং: এই আইনের বলে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের ‘শত্রু’কে বাংলাদেশে এনে নির্যাতন, বিচার, হত্যা পর্যন্ত করা যাবে। আমরা এভাবে প্রভুর হাবিলদারির কাজে নিযুক্ত হলাম। তাদের দেশে মানবাধিকার ইত্যাদির জন্য যাদের বিচার বা নির্যাতন কঠিন হবে বা ব্যয়বহুল হবে, আমাদের সস্তা শ্রমের মতো আমাদের সস্তা সার্বভৌমত্ব তাদের নিকাশে না লাগলে কীসের বন্ধুপ্রতিম আমরা? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগ্রাসনী বুলডোজার যাতে কোনো সীমান্তিক ঝাঁকুনি ছাড়াই মসৃণভাবে বাংলাদেশের সমাজ-রাষ্ট্রের ওপর দিয়ে চলতে পারে, তারজন্য এখানকার আইন-প্রশাসন-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে বহুদিন থেকে। এই আইন বাংলাদেশে বিদেশিদের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের রক্ষাকবচ। খনিজ, গ্যাস, অরন্য এবং মানুষের ওপর তারা যা খুশি করবে, প্রতিবাদ করতে গেলে আপনি হবেন সন্ত্রাসী। তার ওপর ক্ষমতায় আছেন আবার একজন ফুল এক হাফ আর এক সেমি ‘বামপন্থি’। এইসব ঝাণ্ডু বাম প্রকৃত বামকে বলে হঠকারি।

একশ্রেণীর সুশীল নিরাপত্তার জুজুর ভয়ে ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা বিসর্জনে আগ্রহী। এদের স্বাধীনতার চেতনা বায়বীয়। এই আইন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থি, এই আইন শহীদদের আত্মদানের সঙ্গে বেইমানি। অথচ বাংলাদেশের তরুণ তুর্কিদের হুশ নাই। ব্লগাররা আটক, শাহবাগ নিস্তেজ। জাতীয় ঐক্য বলে কিছু নাই। জনগণ দিশাহীন। নতুন আইনে সাইবার কণ্ঠ দমনের বন্দোবস্ত পাকা হচ্ছে, অথচ সাইবার যোদ্ধারা কচুবনে তরোয়াল চালিয়ে হয়রান। ডিজিটাল বাংলাদেশের আসল চেহারা যখন বেরিয়ে পড়লো, তখন আমাদের ডিজিটাল মহানায়কেরা কী একটা গা ঝাড়া দেবেন?

তথ্যসূত্রঃ ফেসবুক

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s